ছবি সংগৃহীত
মোস্তফা কামাল :সংখ্যায় ঈদুল ফিতরের চেয়ে ঈদুল আজহার ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষ বেশি। ভোগান্তির ঝুঁকি-শঙ্কাও বেশি। তাই বলে সরকারের নির্লিপ্ত থাকার অবকাশ নেই। অবস্থা দৃষ্টে ব্যবস্থা নিতেই হয়। বরাবরই এ ঈদযাত্রায় সড়ক-মহাসড়কে গাড়ির চাপ থাকে বেশি। সেইসাথে পশুর হাট ও পশুবাহী ট্রাক চলাচল। যানবাহন বাড়লেও সড়ক-মহাসড়ক সেভাবে বাড়েনি। অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক ঘরমুখী মানুষের স্রোত তৈরির সুযোগে ফিটনেসবিহীন গাড়িও দূরপাল্লায় নেমে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসার স্বার্থে কৃত্রিম যানজট সৃষ্টি করা হয়। সরকার ছুটি বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা তেমন সুফল বয়ে আনতে পারে না। আরো নানা সীমাবদ্ধতা ও কঠিন বাস্তবতার মাঝে এরইমধ্যে ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন ও যানজটমুক্ত করতে সরকার মহাসড়ক, নৌপথ এবং রেলে নিবিড় সমন্বয় ও কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে।
এক হিসাব বলছে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে এবার ঢাকা থেকেই কমপক্ষে এক কোটি যাত্রী দেশের বিভিন্ন স্থানে যাবে। তাদের প্রায় ৮৫ শতাংশই মহাসড়ক ব্যবহার করে। একাধিক বাস মালিক সমিতিসহ সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সংখ্যাটি দেড় কোটির বেশি। এর প্রায় ৮৫ শতাংশই মহাসড়ক ব্যবহার করে। একদিকে মানুষ ঢাকা ছাড়ে, অন্যদিকে পশুবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন ঢাকামুখী হয়। ফলে মহাসড়কে চাপ বেড়ে যায়। সরকার ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ঈদের আগে টানা তিন দিন ছুটি, শিল্প-কারখানা ধাপে ধাপে বন্ধ রাখার উদ্যোগও নিয়েছে। মোবাইল সিমের নড়াচড়া দৃষ্টে বলা হয়, গত বছর ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রায় এক কোটি মানুষ ঢাকা ত্যাগ করেছিল। বিটিআরসি ওই বছর পাঁচ দিনে ঈদযাত্রায় প্রায় ৯০ লাখ সিম ঢাকা ছাড়ার তথ্য দিয়েছিল। ২০২৪ সালের ঈদুল আজহায় এক কোটির বেশি সক্রিয় মোবাইল সিম ঢাকার বাইরে গেছে বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি। ২০২৩ সালে একই ঈদ উপলক্ষে ঈদযাত্রায় চার দিনে ৮৮ লাখ ৭৭ হাজার সিমধারী সিম ঢাকা ছেড়েছিল বলে একই সংস্থার কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিমের সংখ্যার সঙ্গে শিশু ও মোবাইলবিহীন যাত্রীদের যোগ করলে যাত্রীসংখ্যা এক কোটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
সড়ক-মহাসড়কগুলোতে অতিরিক্ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, সদরঘাটসহ বিভিন্ন টার্মিনালে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও নৌযান চলাচলে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। মহাসড়কের যানজটপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ১১৩টি পয়েন্টে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সারা দেশে ৬৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। গত ঈদুল ফিতরে সারা দেশে ২৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হলেও এবার ঈদুল আজহায় সেই সংখ্যা ডাবলেরও বেশি করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বাস টার্মিনাল ও মহাসড়কে এসব মোবাইল কোর্ট দায়িত্বে নেমেছে। বেপরোয়া গতি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে এ কোর্ট। প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিকল বা দুর্ঘটনায় পতিত যানবাহন তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণের জন্য হাইওয়ে পুলিশের বিশেষ রেকার।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ-এর যৌথ উদ্যোগে ফিটনেসবিহীন বা অনুমোদনহীন কোনো নৌযান চলতে দেওয়া হচ্ছে না। যাত্রীদের সুবিধার্থে টার্মিনালে দেয়া হচ্ছে ফ্রি কুলি, হুইলচেয়ার ও ট্রলি পরিষেবা। রেলপথে সিডিউল বিপর্যয় রোধ এবং সহজ ও স্বচ্ছ উপায়ে টিকিট প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা নিয়েছে। কাউন্টারে এবং অনলাইনে সুশৃঙ্খল টিকিট বিক্রি নিশ্চিত করতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। নৌপুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর সমন্বয়ে রাস্তায় চাঁদাবাজি ও যাত্রীদের হয়রানি রোধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগ সহজ করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।
মোট কথা সরকারের দিক থেকে সম্ভাব্য যা করার সবই করা হয়েছে। বাকিটা নির্ভর করছে কার্যকর বা বাস্তবায়নের ওপর। সব কারণ বিদ্যমান রেখে ভোগান্তি-যন্ত্রণা কাটানোর যাবতীয় চেষ্টা কিভাবে বুমেরাং হয়, তার দৃশ্যায়ন ঘটেছে গেল ঈদে। আনন্দের যাত্রাপথে বিষে নীল হয়েছে ঘুরমুখো বহু মানুষ। ভুগেছে জনমের ভোগান্তি। অথচ সরকারের চেষ্টায় কোনো অন্ত ছিল না। গেল রোজার ঈদেও ছিল স্বস্তির যাত্রার ব্যাপক আয়োজন।
স্মরণকালের স্বস্তিদায়ক ঈদ যাত্রার কনফিডেন্সও ছিল সরকারের। শুরুটাও ছিল চমৎকার। কিন্তু, পর পর কয়েকটা দুর্ঘটনা সব এলোমেলো করে দেয়। সরকারকে সইতে হয় সমালোচনা। সেই আলোকে এবার তাই একগুচ্ছ পরিকল্পনা। বিভিন্ন প্রকল্পের উন্নয়নকাজ চলমান থাকা, বৃষ্টিপাতে অনেক জায়গায় মহাসড়কের বেহাল দশা, বৃষ্টির পর মেরামত করা সড়কে ফের খানাখন্দ তৈরি হওয়া এবং মহাসড়কে অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট বসানোসহ নানা কারণে এবার ঝুঁকি ও শঙ্কা বেশি। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে গাজীপুর, আব্দুল্লাহপুর, বাইপাইল ও চন্দ্রা চিহ্নিত করার পাশাপাশি অধিক যানজটপ্রবণ ৯৪টি স্পট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। সে অনুযায়ী নানা উদ্যোগ ও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে। এ সড়কের ৩০ স্থানকে যানজটপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে ২৫টি করে ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ১৪, ঢাকা-ময়মনসিংহে ৯, ঢাকা-বরিশালে ৫, ঢাকা-কক্সবাজারে ৪ এবং যশোর-খুলনা মহাসড়কে ২টি পয়েন্টকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। মহাসড়কসংলগ্ন পশুর হাট বসা, চলমান সড়ক ও সেতুর নির্মাণকাজ, অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো, টোল প্লাজায় ধীরগতির টোল আদায় যানজটকে তীব্র করে। ঢাকার চন্দ্রা ফ্লাইওভারের পশ্চিম পাশ, বাইপাইল মোড়, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল, ভৈরব ও রূপসী বাসস্ট্যান্ড, কুমিল্লার মিয়াবাজার ও পদুয়ার বাজার এলাকা মারাত্মক যানজটপ্রবণ। এ ছাড়া গাজীপুরের বিভিন্ন অংশ এবং মেঘনা-গোমতী সেতু এলাকায়ও বিশেষ নজরদারি রাখা হবে বলে জানিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ।
যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশসহ বিভিন্ন মহলের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে-ঈদের আগে সার্বক্ষণিক ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন, মহাসড়কসংলগ্ন পশুর হাট নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা, দ্রুত সড়ক সংস্কারকাজ শেষ করা, টোল প্লাজায় সব লেন চালু রাখা এবং মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল সীমিত করা। চিহ্নিত এসব ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এবারের ঈদযাত্রায় ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। স্বাভাবিকভাবেই এ ঈদে পশুর হাট খুব প্রাসঙ্গিক। গেল কোরবানির ঈদে মহাসড়কের পাশে ২০০টির বেশি পশুর হাট বসেছে। এবার এ সংখ্যা আরো বেশি। সবচেয়ে বেশি পশুর হাট বসে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সাভার, ঢাকা-ময়মনসিংহ, নাটোর-রাজশাহী, বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক, নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন সড়ক এবং পঞ্চগড় আঞ্চলিক সড়কে। এসব হাটের কারণে সড়কে যানবাহনের গতি কমে, দীর্ঘ যানজট তৈরি হয় এবং তাতে ভোগান্তিতে পড়ে ঘরমুখী মানুষ। বরাবরই মহাসড়কে বা এর পাশে পশুর হাট বসতে না দেওয়ার ঘোষণা দিলেও বাস্তবায়ন সেভাবে হয় না।
নতুন সরকারের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ। সরকারকে এ চ্যালেঞ্জ না জেতার বিকল্প নেই। প্রথমত. ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথগুলোতে যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পদ্মা সেতু বা চার লেন সড়কও স্বস্তি দিতে পারবে না। দ্বিতীয়ত. ঈদে ঘরমুখো মানুষ নির্বিঘ্নে পরিবহন করার জন্য এক বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়া দরকার। তৃতীয়ত. সব কিছু সরকার করবে বা করে দেবে-এ মানসিকতা থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে হওয়া জরুরি। আত্মসম্মান প্রশ্নে ঈদযাত্রায় স্বস্তি আনতে যাত্রী সাধারণেরও দায়িত্ব রয়েছে। আগেভাগে টিকিট সংগ্রহ করা, অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়ে সচেতন থাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাহন ও ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে নিজ থেকেই। অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিৎ। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস বা ট্রেনের ছাদে কিংবা ট্রাকে ও পিকআপে যাতায়াত করলে সরকার তা কতোক্ষণ ঠেকাতে পারবে? আর সেটা কি যাত্রী সাধারণ বা নাগরিকদের জন্য সম্মানের? টার্মিনাল বা স্টেশনে পৌঁছানোর পর পুলিশ-আনসার তাদের ধরে ধরে লাইনে দাঁড় করানো দেখতেও বেমানান।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন








